সূচি

রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০১৬

ইলিয়াসুদ্দির বউ-এর নায়ক

ইলিয়াসুদ্দি। বয়স বত্রিশ। খাটো গোলগাল, শ্যামবর্ণের। মাথার চুল কমে এসেছে। থাকে গ্রামে। একটা মুদি দোকান চালায়। সম্প্রতি বিয়ে করেছে। বউ খুবি সুন্দরী। নিজেকে খুব সুখী সুখী লাগে তার। কিন্তু সুখের এক রকম আছে— বেশি দিন টিকসই হয় না। কোথা থেকে একটা না একটা কষ্ট সেই সুখটারে নষ্ট করে দিতে চায়। এই রকম হয় ইলিয়াসুদ্দির ব্যাপারেও। ব্যাপারটা হলো— সে দেখে তার সুন্দরী বউ সিনেমার নায়ক শাকিব খানের ভক্ত। ভক্ত হতেই পারে। কিন্তু ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের। কিংবা আসলে বাড়াবাড়ি পর্যায়ের না। কিন্তু ইলিয়াসুদ্দির মনে হয়— ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি। যেমন— টেলিভিশনে শাকিব খানকে দেখালেই সে ছুটে যায়। পরিস্থিতি খেয়াল করে না। ইলিয়াসুদ্দির সামনেই সে শাকিব খানের ফটোতে চুমু খায়। একদিন পাশের বাড়ির আলমকে দিয়ে ফটোশপ করে একটা ফটো এনে ঘরে টানিয়ে রাখলো ইলিয়াসুদ্দির বউ, যে কিনা আবার সুন্দরী— এই কথা আগেই বলা হয়েছে। ফটোটাতে শাকিব খানকে জড়িয়ে ধরে রাখছে নায়িকা। নায়িকার মুখের জায়গায় ফটোশপ করে ইলিয়াসুদ্দির সুন্দরী বউ এর ছবি লাগানো। ইলিয়াসুদ্দি বড় ত্যক্ত বোধ করে। বিরক্ত হয়।
একদিন আয়না দেখতে দেখতে হঠাৎ করে ইলিয়াসুদ্দির মনে হয়—আচ্ছা, আমি তো শাকিব খানের মতো সুন্দর না। তাইলে আমার বৌ কি আমারে নিয়া অতৃপ্ত! তার মনের মাঝে শাকিব খান আর শরীরে আমি! মনের মাঝে আর একজনরে নিয়ে আসলে সে কি আমারে ভালোবাসতে পারে!
এই নিয়া ইলিয়াসুদ্দি দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। ফলে সে সুখী হইতে পারে না।
রাতে ইলিয়াসুদ্দি যখন বউকে আদর করতে যায় তখন তার মনে হয় তার বউ- এর মনে তো শাকিব খান আসলে। এই কারণে সে নেতায়া পড়ে। সে আর তার বউকে আদর করতে পারে না। তার সুখের সংসার দাও দাও করে পুড়ে যেতে থাকে। কিন্তু সে তার বউকে ভালোবাসে। সে ভাবে সত্যিই তো। তার বৌ সুন্দর। ফলে সে একজন সুন্দর পুরুষকে ডিজার্ভ করতেই পারে।
এরই মাঝে ঢাকা থেকে দীন মুহাম্মদ, ইলিয়াসুদ্দির শৈশবের বন্ধু বাড়ি ফেরে। দীন মুহাম্মদ তার মোবাইল ফোনে নায়িকা গুলশানারার সাথে নিজের সেলফি দেখায়। তখন ইলিয়াসুদ্দি তাকে জিজ্ঞেস করে যে— নায়ক শাকিব খানের সাথে তার সাক্ষাৎ হয় কিনা। দীন মুহাম্মদ বলে যে— সকালে বিকালে সন্ধ্যায় খালি তার শাকিব খানের সাথেই দেখা হয়। ইলিয়াসুদ্দি কোন কথা বলে না। অশান্তিতে তার দিন কেটে যেতে থাকে।
একদিন ইলিয়াসুদ্দি ঢাকায় যায়। দীন মুহাম্মদের কাছে। শাকিব খানকে সে সামনা সামনি দেখবে। একবার সে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবে। পাশে দাঁড়িয়ে সেল্ফি তুলবে। কিন্তু দীন মুহাম্মদ বলে যে, প্রকৃত অর্থে জীবনেও সে শাকিব খানকে দেখে নাই বাস্তবে। এমনকি নায়িকা গুলশানারাকেও সে সামনা সামনি কোনদিন দেখে নাই। নায়িকা গুলশানারার সাথে তার সেলফিটা আসলে ফটোশপে করা। কিন্তু ইলিয়াসুদ্দির মনে শান্তি নাই। সে একবারের জন্য হলেও শাকিব খানকে সামনা-সামনি থেকে দেখতে চায়। এফডিসির গেইটে সে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু সুযোগ মেলে না।
অনেক কষ্টে, কীভাবে কীভাবে যেন মিতুল আহমেদ নামক এক বিনোদন সাংবাদিকরে ধরে সে শাকিবের সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়ে যায়। ইলিয়াসুদ্দি শাকিব খানকে জড়িয়ে ধরে। হুহু করে কেঁদে ফেলে। সেলফি তোলে। কিন্তু মনে শান্তি মেলে না। আগুন আরো যেন বাড়ে।
মনে অশান্তি নিয়েই সে বাড়ি ফেরার জন্য বাসে চড়ে। ভাবে— বাড়ি ফিরে তার বউকে বলবে যে সে সত্যি সত্যি শাকিব খানকে সামনে থেকে দেখছে। স্পর্শ করেছে। তার স্পর্শ থেকে একটু স্পর্শ কি তার বউ পাবে না! হয়তো বিশ্বাস করবে না তার বউ। তখন সে মোবাইল ফোনের সেল্ফিটা দেখাবে। বাস যখন ফার্মগেইটে, ইলিয়াসুদ্দি জানালার পাশে বসে শাকিব খানের সাথে সেলফিটা দেখছিলো— তখন এক চোর থাবা দিয়ে তার মোবাইল ফোনটা নিয়ে সটকে পড়ে। ফলে শাকিব খানের সাথে তোলা তার ছবি আর সে তার বৌকে দেখাতে পারে না।
ইলিয়াসুদ্দির বউ ইলিয়াসুদ্দির কথা বিশ্বাস করে না। বলে — মিছা কথা। ইলিয়াসুদ্দির মন খারাপ হয়। কে জানে কেন সে বউ-এর সামনেই কেঁদে ফেলে আবেগে। ইলিয়াসুদ্দির সুন্দরী বউ আবেগ ও আদর নিয়ে ইলিয়াসুদ্দির কাছে জানতে চায়— আপনের কী হইছে, কনতো?
ইলিয়াসুদ্দি প্রথমে কিছু বলে টলে না। টালটি-বালটি করে। শেষে সে সমস্তই খুলে বলে। সব শুনে ইলিয়াসুদ্দির সুন্দরী বৌ হাসে। বলে যে— ইলিয়াসুদ্দির মাথা খারাপ।
সে ইলিয়াসুদ্দিরে আরো বুঝিয়া বলে যে, তার আসল শাকিব খান হইতাছে ইলিয়াসুদ্দিই। সে বাস্তব। তারে সে ছুঁইতে পারে, আদর করতে পারে, কাছে পাইতে পারে। আর ঐ শাকিব খান হইতাছে শাকিব খান। সিনেমার নায়িকাদের। সে তো পর্দার মানুষ, বাস্তবে আসবে না কোনদিন। আরও বলে যে— শাকিব খানের চেয়ে আপনে সুন্দর বেশি। আপনে বাস্তব। আপনার মাঝে কোন রঙ নাই, মুখোশ নাই। আর শাকিব খানের মাঝে রঙ আর চরিত্রের মুখোশ।
ফটোশপ করে শাকিব খানের সাথে তার বউ এর যে ছবিটা দেয়ালে টানানো ছিলো, ইলিয়াসুদ্দির বউ শাকিবের মুখের জায়গায় ইলিয়াসুদ্দির মুখের ছবি কেটে লাগিয়ে দেয়। 

আলো নিভে। চুড়ির শব্দ শোনা যায়। ইলিয়াসুদ্দির মিহি হাসির শব্দ আসে